ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া ও মহারাজপুর ইউনিয়নের সংযোগস্থলে অবস্থিত ৪৫ বছরের পুরনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ। দীর্ঘ ৯ মাসেও ব্রিজটির পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় বাধ্য হয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করছেন।
ভাঙনের পটভূমি
গত বছরের বর্ষা মৌসুমে প্রবল বৃষ্টিপাত ও পানির তোড়ে ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের’ খালের ওপর নির্মিত ব্রিজটি ভেঙে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ওই খালের ওপর ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ব্রিজটি নির্মিত হয়েছিল। বয়সজনিত কারণে ব্রিজটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু বর্ষার প্রকোপই চূড়ান্ত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় বাসিন্দা টোকন মিয়া বলেন, “৯ মাস আগে ব্রিজ ভেঙে গেছে। আমরা বারবার বিভিন্ন অফিসে জানিয়েছি, তারপরও কোনো সমাধান পাইনি। কবে ব্রিজ হবে কেউ বলতে পারে না।” ব্রিজটি ভাঙার পর থেকেই ‘বিষয়খালী জিসি-নগরবাথান জিসি ভায়া ডেফলবাড়ী’ সড়কটি যানবাহন চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে সড়কটির ওপর যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
ভাঙা ব্রিজের জায়গায় বাঁশের সাঁকো
ভাঙা ব্রিজের পাটাতন এখনও খালের মাঝখানে পড়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে ভাঙা ব্রিজটির ওপর একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়েই পারাপার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তবে এই অস্থায়ী সাঁকোটিও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ফলে অটোরিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলের মতো ছোট যানবাহনও চলাচল করতে পারছে না। স্কুলগামী শিশুদের সাইকেল নিয়ে পারাপার হওয়ার সময় প্রাণ সংশয় তৈরি হয়েছে।
দুই স্কুলশিক্ষার্থী সিফাত ও তানজিম হোসেন বলেন, “আমরা নিয়মিত এই ব্রিজ পার হয়ে স্কুলে যেতাম। গত বছর ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার পরে সাঁকো বানানো হয়। এখন সাঁকোটিও ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে বাইসাইকেল নিয়ে পার হওয়ার সময় ভয় লাগে।”
ব্রিজ ভাঙার প্রভাব: অর্থনীতি ও কৃষি
ব্রিজ ভাঙার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে কৃষি অর্থনীতিতে। মিনিট্রাক চালক ফিরোজ মাহমুদ জানান, তিনি নিয়মিত কুমড়াবাড়িয়া ইউনিয়নের বাজার থেকে পণ্য নিয়ে মহারাজপুর ইউনিয়নের বাজারে যেতেন। ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষকরা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্রিজটি ব্যবহার করে তারা দ্রুত তাদের কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছে দিতে পারতেন। বর্তমানে কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, যা মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একইভাবে মহারাজপুর ও কুমড়াবাড়িয়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পণ্য সরবরাহের বিকল্প পথ না থাকায় ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। ব্রিজটি না থাকায় ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। জরুরি অবস্থায় রোগী নিয়ে যাওয়ার সময় দ্বিগুণ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সদর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, সড়কটির ওপর দুটি পুরনো ব্রিজ ছিল, যার মধ্যে একটি পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। ভাঙা ব্রিজটি পুনঃনির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে দুটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, “অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই প্রকল্প অনুমোদন হয়ে যাবে। প্রকল্প অনুমোদন হয়ে গেলেই আমরা ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব।”
তবে স্থানীয়রা এই আশ্বাস নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাদের দাবি, ব্রিজ ভাঙার ৯ মাস পরও প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ার অর্থ হলো তারা আরও অনির্দিষ্টকাল ভোগান্তিতে থাকবেন।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও কর্তৃপক্ষের নীরবতা
ব্রিজ ভাঙার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের একাধিক ব্যারিস্টারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কিন্তু কোন ফলপ্রসূ উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসমত বিশ্বাস বলেন, “আমরা বারবার বিভিন্ন অফিসে জানিয়েছি, তারপরও কোনো সমাধান পাইনি। ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় এই সড়কে সব ধরণের যানবাহনের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মোটরসাইকেলও যেতে পারছে না।”
শিক্ষার্থী আসমা ইসলাম বলেন, “নিয়মিত এই ব্রিজ পার হয়ে স্কুলে যেতে ঝুঁকি নিতে হয়। গত বছর ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার পর একটি সাঁকো তৈরি করা হয়। এখন সেটিও ভেঙে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে।”
আসন্ন বর্ষার হুমকি
আসন্ন বর্ষা মৌসুম এলেই পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বর্ষার পানিতে খালের পানি বেড়ে গেলে বাঁশের সাঁকোটি সহজেই ভেসে যেতে পারে। তখন পারাপারের একমাত্র মাধ্যমটিও হারিয়ে যাবে, যা দুই ইউনিয়নের মানুষের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
স্থানীয়রা দ্রুত ব্রিজ পুনঃনির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন। জনস্বার্থে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তারা বলেন, “আমরা আর ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে পারি না। একটি নিরাপদ ব্রিজ আমাদের মৌলিক অধিকার।”
সার্বিক বিশ্লেষণ
ঝিনাইদহে ব্রিজ ভাঙা শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, এটি দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতার একটি বড় ইঙ্গিত বহন করে। ৪৫ বছরের পুরনো ব্রিজটি মেরামত না করে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বয়সসীমা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিবর্তন করা হয়।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রিজ ভাঙার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এখানে ঘটনার গুরুত্ব অন্যরকম—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের ব্রিজ, যা ভেঙে যাওয়ায় দুটি ইউনিয়নের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বর্ষা আসার আগেই ব্রিজ নির্মাণ সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও করুণ হয়ে উঠবে।
প্রতিকার ও করণীয়
স্থানীয় প্রশাসনের উচিত জরুরি ভিত্তিতে ভাঙা ব্রিজের স্থানে একটি ভারী বাঁশের সাঁকো বা সামরিক বাহিনীর সাঁকো (বেইলি ব্রিজ) স্থাপন করা, যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে যানবাহন চলাচল চালু করা যায়। পাশাপাশি, পুনঃনির্মাণ প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন করে কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
জনপ্রতিনিধিদেরও এই বিষয়ে আরও সোচ্চার হওয়া উচিত। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের ব্রিজটি পুনঃনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাছাড়া, স্থানীয় সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়মিত এই খবর প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সুশীল সমাজেরও এগিয়ে আসা দরকার।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত বিকল্প পথ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা বা অভিভাবকদের সতর্ক করা। নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করা যেকোনো সময় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
উপসংহার
৪৫ বছরের পুরনো ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কুমড়াবাড়িয়া ও মহারাজপুর ইউনিয়নের মানুষ। অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোয় ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন স্কুলশিক্ষার্থী ও কৃষকসহ হাজারও মানুষ। প্রশাসন দ্রুত ব্রিজ পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ না নিলে আসন্ন বর্ষায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। জনস্বার্থে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি।