কিম সে-ইনের জীবনসংগ্রাম: পরিবারের তাগিদে নগ্ন দৃশ্য আর আজ

দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন অঙ্গনে একসময় যার নাম উচ্চারিত হতো সমীহ ও শ্রদ্ধায়, সেই জনপ্রিয় অভিনেত্রী কিম সে-ইন হঠাৎ করেই সব আলো থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন। বছর পেরিয়েছে, সময় বদলেছে, কিন্তু তাঁর মুখে তখনকার বেদনার ছাপ এখনও মোছেনি। সম্প্রতি এমবিএন চ্যানেলের ‘স্পেশাল ওয়ার্ল্ড’ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে তিনি ভেঙে পড়েছেন, খুলে বলেছেন নিজের জীবনের সেই অজানা অধ্যায়ের কথা, যা শুনলে চোখে জল আসবে।

২০০৪ সালে ‘সেম বেড, ডিফারেন্ট ড্রিমস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কিম সে-ইনের অভিনয় জগতে অভিষেক ঘটে। এরপর ২০১১ সালে এসবিএসের ‘ওহ মাই গড’-এ অংশ নিয়ে তিনি দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের সেই উজ্জ্বল সময়েই থমকে যায় সবকিছু। ২০১৩ সালে তিনি অভিনয় জগৎ থেকে চিরবিদায় নেন। দীর্ঘদিন ধরে কেন তিনি আড়ালে ছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেই এবার পর্দায় ফিরেছেন তিনি।

অনুষ্ঠানে কিম সে-ইন জানান, পরিবারের ভরণপোষণ ও গুরুতর আর্থিক সংকটের কারণেই একসময় তাকে নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার সংস্থার প্রধান আমাকে নানা বিনোদনকেন্দ্রে নিয়ে যেতেন এবং নিয়মিত মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন’। সেই সময়টায় তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ‘প্রতিটি দিন নরকের মতো ছিল। বেঁচে থাকতেই ঘৃণা লাগত’—অভিনেত্রী জানান

তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ী বাবার পরিবারে বড় হলেও একসময় আর্থিক সঙ্কটে তাঁদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এক পর্যায়ে তাঁদের গুদামঘরেও থাকতে হয়েছিল। মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ মেটাতে তাঁকে পেশাদারি অভিনয়ের পথে হাঁটতে হয়। কিন্তু সেই পথও ছিল কাঁটায় ভরা।

অভিনেত্রীর ভাষায়, ‘তখন কয়েক কোটি ওন খুবই দরকার ছিল। পরিবারের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়েছিল। সেই সময় জীবিকার তাগিদে নগ্ন দৃশ্যেও অভিনয় করেছি’। এই সিদ্ধান্তে তাঁর বাবা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন

বর্তমানে কিম সে-ইন অভিনয় থেকে সম্পূর্ণ দূরে। তিনি সাতটি পরিত্যক্ত কুকুর, খরগোশ, মুরগিসহ মোট ১৫টি প্রাণীর দেখাশোনা করেন। এই প্রাণীগুলোই তাঁর এখন পরিবার। সংসারের খরচ ও এই প্রাণীদের খাবারের যোগান দিতে তিনি খাবার সরবরাহের খণ্ডকালীন কাজ করেন

ভবিষ্যৎ নিয়ে কিম সে-ইন বলেন, ‘আমি ভালোভাবে বাঁচতে চাই। কঠোর পরিশ্রম করে এখন যে বড় পরিবারটি আমার আছে, তাদের শেষ পর্যন্ত আগলে রাখতে চাই’। তাঁর মা গত ১৫ বছর ধরে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে কোমায় রয়েছেন। আর মাত্র দুই বছর আগে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা। কিম সে-ইন জানান, বাবাকে দেওয়া শেষ প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই তিনি এই পরিত্যক্ত প্রাণীদের যত্ন নিচ্ছেন


কিম সে-ইন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • জন্মস্থান: ইনছন, দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৯২ সালে)
  • অভিষেক: ২০০৪ সালে ‘সেম বেড, ডিফারেন্ট ড্রিমস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে
  • জনপ্রিয়তা: ২০১১ সালে ‘ওহ মাই গড’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে
  • অভিনয় ত্যাগ: ২০১৩ সালে
  • বর্তমান পেশা: খাবার সরবরাহের খণ্ডকালীন কাজ
  • বর্তমান পরিবার: ১৫টি পরিত্যক্ত প্রাণী

দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন শিল্পের চকচকে পর্দার আড়ালে কিম সে-ইনের জীবন যেন এক কঠিন বাস্তবতার দর্পণ। যেখানে স্বপ্ন ছিল অভিনয়ের, সেখানেই তাকে খুঁজতে হয়েছে বেঁচে থাকার পথ। তাঁর গল্প আমাদের প্রত্যেককে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের কঠিন সময়েও নিজের মর্যাদা আর ভালোবাসার মানুষগুলোকে আগলে রাখার শক্তি হারানো উচিত নয়।

Leave a Comment